বিভাগ সমূহ :

করোনা ভাইরাস বনাম মানুষের বেঁচে থাকা

আরিফ মিলন
কথা সাহিত্যিক ও তরুণ উদ্যোক্তা
মরণঘাতী করোনো ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিশ্ব আজ একযোগে থমকে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখার সকল প্রকার যন্ত্র বিকল প্রায়। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা নব্বইয়ের কাছাকাছি এবং মৃতের সংখ্যা নয়। গত দুই দিনের পরিসংখ্যান সবাইকে আরও আতঙ্কিত করে তুলেছে।
ইতোমধ্যে পুরো দেশ লক ডাউন ঘোষনা করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালত ছুটির মেয়াদ তৃতীয় দফায় এপ্রিলের ১৪ তারিখ পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে।
পোশাক শিল্প কারখানাগুলোতে ছুটি জনিত বিষয়ে রুবানা হকের বালখিল্যতার চরম মাশুল এদেশকে দিতে হতে পারে। বাংলাদেশের অবস্থা সামনে কী হবে তা বোঝা আপাতত হয়ত দুষ্কর ছিল। কিন্তু স্রোতের মত গার্মেন্টস কর্মীদের ঢাকামুখী হওয়ায় দেশের অবস্থা কতটা করুণ হতে পরে তা সহজেই অনুমেয়। দেশের বড় বড় রথীমহারথীদের মধ্যে সমন্বয়হীনতাই এর প্রধান কারণ।
এদিকে দেশের জনসাধারণের একটা বড় অংশ লক ডাউন মানছে না। যত্রতত্র অসচেতনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যে কারণে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার সেনাবাহিনী মাঠে নামাতে বাধ্য হয়েছে।দেশের এই লকডাউন পরিস্থিতিতে দেশের সকল শ্রেণী পেশার মানুষ হোম কোয়ারেন্টিনে তথা স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী এবং কর্মহীন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে সরকারি চাকরি করেন ৩.৮%, বেসরকারি ১৪.২%, ব্যক্তি মালিকানাধীন ৬০.৯% এবং অন্যান্য ২১.১%। বিগত দেড় বছরে এই পরিসংখ্যানের খুব বেশি উন্নতি হয়েছে বলে আশা করা যায় না। একমাত্র সরকারি চাকরীজীবীরা ঘরে বসেও শতভাগ মাসের পুরো বেতন পেতে পাবেন। বেসরকারি চাকরিজীবীর খুবই ক্ষুদ্রতম অংশ আংশিক বেতন পেতে পারেন। তাতেও সন্দেহ রয়ে গেছে। বাকীরা ঘরে বসে থেকে মাসের বেতন পাবেন বলে আশা করে থাকলে তা দিবাস্বপ্ন বৈ অন্য কিছু হবে না।
রেস্তোঁরা, সিনেমা, পরিবহন, হোটেল এবং প্রায় দোকান বাজারসহ সব কিছুই বন্ধ রয়েছে। এসবের প্রত্যেকটির সাথে পত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে  নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবন ও জীবিকা জড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক হিসেব মতে, বাংলাদেশে বিশ দশমিক পাঁচ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে এবং দশ দশমিক পাঁচ শতাংশ মানুষ অতি দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে।
বিশাল জনগোষ্ঠীর সর্ববৃহৎ অংশ দিন এনে দিন খায় এবং তার থেকেও অধিকজনের কোন প্রকার সঞ্চয় নেই। উপরন্তু তারা বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিকট দায়গ্রস্ত।
এদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রাক্কলনে করোনার প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ তিন দশমিক দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে পারে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
দেহের একটি অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব কম-বেশি সবজায়গায় পড়ে। এক্ষেত্রেও বিষয়টি তাই। উদাহরণ স্বরুপ, দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকায় বাসটার্মিনাল যাত্রী শূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে যাত্রী বহনে সহযোগী বাহন যেমন, ভ্যান, রিকশা, সিএনজি চালকেরা কর্মহীন। এসকল যাত্রীদের কেন্দ্র করে আশপাশে যেসকল দোকানপাট, খাবারের হোটেল, চা স্টল ছিল তারাও কর্মহীন। একজন কর্মহীন মানে একটি পরিবার তথা কতজনের মুখের অন্ন ঝুঁকির মুখে পড়বে ভাবলেই শরীর হিম হয়ে আসে।
তবুও করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার কোনো বিকল্প নেই। লক ডাউনই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। কিন্তু এই বেঁচে থাকার লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার পথে ক্ষুধা প্রধান অন্তরায় হয়ে দেখা দিবপ।
পা ফাটা খেটে খাওয়া মানুষের আর্তনাদে বাতাস ভারি হয়ে উঠবে। এমনকি নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের মানুষদের নিরব চাপা কান্নায় বালিশ ভিজে উঠবে। কেউ জানতেই পারবে না। তার উপরে বিশ্বব্যাপী এই মহামারীর প্রকোপ থেমে গেলেও আরেক মহামারী দেখা দিবে তা হলো কর্মী ছাটাই। আইএলও’এর এক হিসাব মতে গোটা বিশ্বে প্রায় আড়াইশ কোটি লোক কর্মহীন হয়ে পড়তে পারেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ থাকে যে, ২০০৮-৯ অর্থবছরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময় দুইশত কোটির অধিক কর্মজীবী কর্ম হারিয়েছিল।
অর্থনীতি এবং শ্রমবাজার একে অপরের পরিপূরক। একটি বাঁচলে অন্যটি বাঁচে। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ক্রান্তিলগ্নে এই সত্যটিই নির্মম হয়ে দেখা দিবে।
বলা হয়ে থাকে “Necessity knows no law.” প্রয়োজন যখন সামনে এসে দাঁড়াবে তখন তা কোনো আইন মানবে না। এবং এটাই স্বাভাবিক সত্য। জীবন এতটাই নির্মম যে, কর্ম আছে কি নেই, আয় আছে কি নেই এসব সে দেখতে চায় না। তার একটিই দাবি, আমাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আমার খাদ্য চাই, প্রয়োজনে চিকিৎসা চাই, মাথা গুঁজার ঠাই চাই।
এমনটা চলতে থাকলে এবং মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়লে তারা ক্রমে বিপদগামী হয়ে উঠবে। এমনকি এই ধারা খুব বেশিদিন অব্যাহত থাকলে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিরা বেপরোয়া হয়ে উঠবে। দেশে চুরি, ডাকাতি, খুন, ছিনতাই, রাহাজানি ও দূর্নীতি বাড়বে। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটবে। হতাশা ও আত্মগ্লানি থেকে আত্মঘাতী ঘটনার প্রকোপও বাড়বে।
ঘটনা ঘটার আগেই সরকারের উচিত হবে এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ভর্তুকি এবং প্রণোদনা সহায়তার মাধ্যমে বিভিন্ন খাতকে উজ্জীবিত রাখতে হবে। ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা এবং সততা নিশ্চিত করা চাই। প্রয়োজনে আইন করে বেসরকারি এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোয় কর্মজীবী মানুষদের বেতন নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান (ব্যাংক, এনজিও) গুলো শুধু সময় বাড়িয়ে নয়, তিন মাসের সুদ মওকুফ করতে পারে। এতে করে ক্ষুদ্র এবং মাঝারি উদ্যোক্তারা প্রাণে রক্ষা পাবেন।
শুধু নামমাত্র ত্রাণ সহযোগিতা নয়, এলাকাভিত্তিক খেটে খাওয়া মানুষের নামের তালিকা করে (পরিবারের সদস্য সংখ্যাসহ) প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ সহযোগিতা করা যেতে পারে। ত্রান গ্রহণকারীর ছবি তোলা যেন মুখ্য না হয়ে দাঁড়ায় সেটিও খেয়াল রাখা বাঞ্চনীয়। বিপদকালীন এই মুহূর্তে কার কী প্রয়োজন হতে পারে তা সরকারের আগে থেকেই বিচার বিবেচনা করতে হবে এবং তদানুযায়ী তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে  হবে।
মনে রাখতে হবে, করোনা ভাইরাসের এই সংকটকালীন মুহূর্তে একটা লোকও যেন অভাবের তাড়নায় বিপদগামী হয়ে না পড়ে। করোনা থেকে জীবন রক্ষা করতে গিয়ে ক্ষুধার জ্বালায় যেন জীবন দিতে না হয়।

একটি উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন

- Advertisment -

সর্বাধিক পঠিত

লালপুরে কৃষক-কৃষানীর প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত

নিজস্ব প্রতিবেদক, লালপুর নাটোরের লালপুরে ২০১৯-২০ অর্থবছরে কন্দল জাতীয় ফসল উৎপাদনে আধুনিক কলাকৌশল বৃদ্ধিতে উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দিনব্যাপী কৃষক-কৃষানী প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার দুপুরে লালপুর...

নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত কাঠমিস্ত্রিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, আসছে বর্ষাকাল,বিল এলাকা নামে পরিচিত নাটোরের বিভিন্ন গ্রাম অঞ্চলের জেলে পাড়ায় চলছে বর্ষাকালের নানান আয়োজন । বিশেষ করে নাটোরের জেলে সম্প্রদায়ের লোকেরা এখন...

নাটোরে করোনা উপসর্গ নিয়ে গৃহবধূর মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক, নাটোরে করোনা উপসর্গ নিয়ে রুমা (২২) নামে এক গৃহবধুর মৃত্যু হয়েছে। নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালের আইসলেশান ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার ভোররাতে তার মৃত্যু...

লালপুরে ওয়ালিয়া ইউপি’র উন্মুক্ত বাজেট ঘোষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক, লালপুর নাটোরের লালপুর উপজেলার ওয়ালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ২০২০-২০২১ অর্থ বছরের উন্মুক্ত বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। শনিবার দুপুরে দেশ ব্যাপী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব রোধে সামাজিক...